Work Text:
একটা ছোট টেবিল, কতগুলো বই, জামা কাপড় রাখার একটা বাক্স এসব নিয়ে আমার যে এই ছোট্ট সংসার গুটিয়ে দিব্যি বেঁচে আছি কলকাতার এই ছায়াপড়া পাড়ার ঘরটিতে তা ভাবতে ভাবতে এখন অবাক মনে কেমন হাসি দোল দিয়ে যায়। জীবনে সেভাবে বাড়ি থেকে না বেরোনো ছোকরা এখন কি উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে বিদেশ বিভুঁই এ ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে তার কৈফিয়ত দিতে দিতেই যে যুবা জীবনের সিংহ ভাগ সময় বয়ে যাবে, তার জন্য আর বেশি ভাবী না। লেখালিখির শখ, চাকরির খোঁজ ইত্যাদি ইত্যাদি তামাদি ব্যাখ্যা আগেও দিয়ে এসেছি, চলতি পথে চেনা মুখ দেখলে সম্ভ্রম প্রকাশের সাথে সাথে উত্তর গুলো ও রেডি করা থাকে, ফাঁক বুঝলেই চালিয়ে দিই। এভাবে চলতে চলতে যেদিন নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজেরই খটকা মাকড়শার জাল এর মত ঘনাতে লাগল সেদিন বুঝলাম - নাহ্! মগজাস্ত্র শুধু শান দেয়ার বস্তু নয়, তাতে কিঞ্চিৎ হাওয়া লাগিয়ে তাকে ঠান্ডা রাখাও প্রয়োজন।
তখন নভেম্বর এর শেষ।
এটা তো আর আমাদের এঁদো গ্রাম নয়। এ হলো শহর কলকাতা। পৌষ মাসে মাটির ঘর থেকে সকাল বেলা মাঠে না যাওয়া আজন্ম বাবুরা বুঝবে না ঠান্ডার বাঘা প্রকোপ কেমন হতে পারে। ব্যাগ টা তাই নারা ঘাটা করে দেখছিলুম, একটা চাদর এর প্রয়োজন হবে কিনা। বাড়ি থাকলে এতদিনে দাদুর সেই মোটা চাদর গায়ে উঠে যেত।
ব্যাগ হাতড়াচ্ছি এরম সময় ডাক শুনলাম,
" বাবু, ইয়ে কাগাজ ইয়াহাপার রাখ দিয়া তো বো ছোকরা লোগ ফির লে জায়েঙ্গে। আপ থোরা নিচে আইয়ে না"
খবর এর কাগজ না হলে আমার কেমন যেন পেটের ভাত হজম হয়না। একবার চোখটা বুলিয়ে নিলে বেশ মনে হয় নাহ যাক, দিনের একটা বাঞ্ছিত খোরাক পাওয়া গেল। তো সেই মত এক কাগজওয়ালা ঠিক ও করেছিলাম যার গ্রাহক এই ফ্ল্যাট এরই অন্যান্য অনেকে। প্রথম এক সপ্তাহ ভালই চলল, হঠাৎ দ্বিতীয় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দেখি কাগজ নেই, ভালো কথা। পরের তিন দিন ভালই পেলাম কিন্তু দুই সপ্তাহ পর আবার একই ঝামেলা। কোনো জাতীয় ছুটি নেই, সংবাদ মাধ্যমের নিশ্চই এত টাকা বেড়ে যায়নি যে রোজ রোজ ছুটি দেবে। তো সন্দেহ হলো চুরি ই হচ্ছে। প্রতিদিন কে বা কারা নিয়ে যায়। তখন দারোয়ান বলে,
" বাবু, হাম দেখে গা। ওয়াহা পাড়া কে মোড় মে বহুত বজ্জাত ছোকরা আছে। উহারা কিছু কিয়ে থাকবে। হাম খোঁজ নিব?"
প্রথমত, আমি তখন এই জায়গায় নতুন নতুন। ভদ্রতার খাতির এর চেয়ে যেটা বেশি ছিল সেট হলো - সোজা কথা ক্যাঁচাল পাকাতে চাইনি। মারওয়ারি ছোকরা ওরা, ওদের এখানে লোকজন আছে, বিশেষত এই এলাকায় বাঙালি হিন্দু সংখ্যালঘু। যদি ওরা করেও থাকে, দারোয়ান দিয়ে ওদের ঠান্ডা দিয়ে গিয়ে পরে বংশ দণ্ড হজম করার আগ্রহ আমার ছিল না। দারোয়ান যখন ছট কিংবা কোনো পরবে বাড়ি যাবে তখন ফাঁক পেয়ে যদি ওরা আমাকে রাস্তায় ধরে…? ওসব কথা মাথায় না এনে চুপ থাকা ভালো। তাই বেশ কিছু দিন খবর কাগজ খোয়া গেলেও কিছু বলিনি।
আজকে এই সকাল বেলা দারোয়ান এর কথা শুনে কেন জানিনা মনে হলো, কাগজ যায় যাক, আমি আর নিচে নামতে পারছি না। যদিও কিছুক্ষণ পর আমি বেরোব।
জবাব দিলাম, " দরজায় রেখে দাও"
বলে আমি ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে গায়ে জড়িয়ে দেখি জানলার ফাঁক দিয়ে দারোয়ান কে এখনও কাগজ হাতে দেখা যাচ্ছে।
কি মনে হলো, আমার বই বাঁধার জন্য একটা দড়ি এনেছিলাম ( একটু বেশি ই বড় ছিল) সেটা র এক দিক জানলার গরাদে বেঁধে আরেক প্রান্ত নিচে নামিয়ে দিলাম। বুদ্ধিটা এতদিন কেন আসেনি জানিনা। আর এখনই বা কেন আসল তাও জানিনা।
কাগজ তুলে নিয়ে খানিক চোখ বুলিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। বেরোনোর সময় দারোয়ান হা করে তাকিয়েছিল কিনা খেয়াল করলাম না।
শীতের আড়মোড়া ভেঙে শহর তখন জাগছে ধীরে ধীরে। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা রা স্বাস্থ্যরক্ষার্থে মর্নিং ওয়াক এ বেরিয়ে পড়েন বটে তবে এক শ্রেণীর মানুষ ছাড়া এই অভ্যাস, বলা বাহুল্য কারোরই তেমন ধাতে আসেনি। শহর প্রকৃত অর্থে জেগেছে মুটে, ঠেলাগাড়ি র চালক, ঝাড়ুদার, ম্যাথরদের শুকনো কাশি তে। ছোট খাটো মজুর কিংবা খাবারের দোকানদার দের উনুনের আঁচে। সেই উনুনের কয়লা এতই কম যে তার ঘুমভাঙানি উত্তাপ দোতলার বারান্দায় পৌঁছায় না।
সামনের চৌরাস্তার মোড়ে বাঁক নিতে গিয়ে চোখে পড়ল একদল বাচ্চা ছেলে মেয়ে, মলিন বস্ত্রে ল্যাম্প পোস্ট টার পাশে জটলা করছে। কিছুই না, একটা গাছের ডাল জাতীয় কিছু, তাতে প্লাস্টিক জাতীয় কিছু লেগে, ওই নিয়েই ওদের কাড়াকাড়ি। আমি ওদের থেকে দুইহাত দূরে দাড়াতে হল্লা থেকে বছর সাতেকের একটা বাচ্চা ছেলে দৌড়ে এদিকে এল। ছেলেটা আমাদের দারোয়ান এর নাতি, নাম অভয়সরণ ওর বাবা ধোবি আর মা একটা রাস্তার পাশের ছোট্ট হোটেল এ রান্না করে। সারাদিন বেশীরভাগ সময় এই চৌরাস্তার মোড়ে, যেখান থেকে একটা সরু রাস্তা ভদ্রপল্লী থেকে ক্যাত করে বাঁক খেয়ে সংকীর্ণ বস্তির মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়েছে, সেখানে নিজের মত আরো কয়েকজন কে নিয়ে খেলা করে ও। আজও সেইরকম চলছিল। আমি আমার ছোট্ট ঝোলাটা হাতড়ালাম, দেখি একটা লাড্ডু রয়েছে।
আমাকে দেখে আগেই যে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে খেয়াল করেছিলাম। সে জটলা ছেড়ে এগিয়ে এসে তার বস্ত্রের চেয়েও মলিনতর ছোট্ট হাত টা আমার সামনে এগিয়ে দিল। আমি এক হাঁটু গেড়ে বসে ঠোঙ্গা শুদ্ধ লাড্ডু টা তার হাতে দিলাম। অত বড় ঠোঙ্গা তার হাতের তালুতে আটলো না!
আমি উঠে দাড়িয়ে ফুটপাথ থেকে রাস্তার দিকে পা বাড়াতে যাব এরম সময়, আমার জামার পিছন দিকে টান পড়ল।
ফিরে দেখি অভয় দাড়িয়ে আছে। আমার দেয়া ঠোঙ্গা টার কি হলো জানিনা তবে ও আমাকে একটা লজেন্স মতন কি, কাগজে মোড়া, দিয়ে আবার শিশুসুলভ উল্লাসে নাচতে নাচতে ফিরে গেল।
ধোবি রামসরণ প্রতিদিনের মত এক তাবুর নিচে ইস্ত্রি দিয়ে জামা কাপড় সমান করছিল, আমাকে দেখতেই বলে উঠল,
" সাহেব এর শরীর ঠিক নেই?"
রামসরন এর বয়স যখন অভয় এর এর থেকেও ছোট তখন তার বাবা, আমাদের দারোয়ান হরিরাম পাটনা থেকে স্ত্রী ছেলেপুলে সহ কাজ অন্বেষণে কলকাতায় এসে পড়ে। তাই ছোট বেলা থেকেই রামসরন এই বাংলায় মানুষ। পরিবারের না নিজের লোক ছাড়া , বাঙালি দের সাথে কথা বলতে গেলে ওর গলায় আর হিন্দুস্থানী দেহাতি টান লাগে না। ওর এই স্পষ্ট বাংলা, কেন জানিনা আমার বেশ ভাল লাগে বরাবর, কিন্তু আজকে সংক্ষেপে জবাব দিয়ে দ্রুত পদে উপরে উঠে গেলাম।
ঘরের জানলাটা আটকে যাইনি। একটা শীতল তরল বায়ু ঘরের মধ্যে জমে রয়েছে স্মৃতির মত। জানলাটা আটকে আমি ধপ করে বসে পড়লাম।
এই আমার ঘর, আমার বই পত্র, হিসেবহীন হিসেবের খাতা, তক্তপোশ, আলনা, আলমারি আর আমি। সবকিছুর প্রতি আমি বেশ যত্নশীল। আমার বইগুলোর একটা পাতা তে ভাঁজ পড়েনি, নোংরা কালির দাগে তার মান যায়নি, ইচ্ছে হলে এখনই বেচা যেতে পারে প্রায় কেনা দামে। ঘরটাও ছিমছাম, প্রতিদিন সময় পেলেই আমি পরিষ্কার করি, যতটা না করলেই নয়। একাই মানুষ থাকি এই একলা ঘরে, জামা কাপড় ধোয়ার বলতে আমি নিজেই নিজের ধোপা, মায়ের কাছ থেকে যেমন যেমন শিখেছি, সেই টুকু কাজ নিজে হাতে ই ভালোভাবে করতে পারি, আলনা গুছিয়ে রাখতে ও তেমন বেগ পেতে হয়না। শুনেছি অনেক পরিপাটি ভদ্রলোক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নিজের ' পরিপাটিত্ব ' বিসর্জন দিয়ে নবজীবন আলিঙ্গন করেন। ভগবান করুন আমার সেই সৌভাগ্য না হয়। একা পুরুষ মানুষ যে সাংসারিক কাজ কর্মে অকর্মের ঢিপি, এই নিন্দা আবাল্য শুনেছি ও অধিকাংশ পুরুষ মানুষকে এই নিয়ে অহেতুক গর্ব ও করতে দেখেছি আর মনে মনে ভেবেছি - আহারে!
এই আমার ঘর, এই আমার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিপাটি সংসার। যার মধ্যে একমাত্র তালের অভাবে বেতাল তালে আমার সুর বাজছে। এতে মাঝে মাঝে আমার উত্তেজনা হয়, গর্ব হয় আবার ক্ষনিকের জন্য যেন এক কিসের নিমিত্ত বৈধব্য বিষাদ ঘিরে ফেলে। তবে সেই ভাবনা মনে আসলেই, পেনের কালির মত ছুঁড়ে ফেলে দিই।
