Chapter Text
পাষাণের ভাঙালে ঘুম কে তুমি সোনার ছোঁয়ায়
গলিয়া সুরের তুষার গীতি নির্ঝর বয়ে যায়
জৈষ্ঠ্যের তপ্ত বালুকায় সে ছিল কালবৈশাখীর প্রথম ধারা। শুষ্ক ধরণীতে প্রথম বর্ষার আহ্বান।
চৈত্র মাসে যে নদীকে নৌবন্দর এর প্রহরস্তম্ভ হইতে শান্ত মনে হয়, মধ্যাকাশে দিনমনি প্রগাঢ় তেজে জ্বলিতে থাকে - তাহার ক্ষমা নাই। নদীতে মাঝিরা নামিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়ে - দাবদাহ যেন তাহাদের প্রাণ শুষিয়া ছিবড়া করিয়া ছড়াইয়া দেয়। প্রকৃতি তখন বড়ই নিষ্ঠুর, অতীব কঠোর; নমনীয়তার লেশমাত্র তাহার মধ্যে নাই। কলচক্রের রথে বসিয়া সে তাহার কর্তব্য পালন করিতেছে।
কিন্তু একদিন…পশ্চিম দিগন্তে যেদিন কৃষ্ণবর্ণ মেঘ ঘনাইয়া উঠিল - কেহ প্রথমে তেমন আমল দেয়নাই। কিছু অভিজ্ঞ বয়স্ক যদিওবা অশনি সঙ্কেতের ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, তাহাদের আশঙ্কাবাণী মেঘগর্জনের কালে বাতাসির ডাকের মত মিলাইয়া গেল।
ধীরে ধীরে বট, অশ্বত্থ, ছাতিম , অর্জুন, নারকেল গাছের মাথায় দোলা লাগিল। দিগন্তবিস্তৃত আউশ এর ক্ষেত্রে সবুজ লহরী উঠিয়া মোলায়েম স্পর্শে বহিয়া যাইতে লাগিল। চারিদিক অন্ধকার। টু পাতাটি নড়ে না। তারপর হুট করিয়া বাতাস উঠিল। সে কি পাগল হাওয়া! দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য করিয়া যখন ঝড় প্রলয়ংকর রূপ নিল তখন ও বুঝিল -
সে মরিয়া বাঁচিয়াছে।
তাহার জগৎ টলিয়া উঠিল।
জন্মাবধি এই পঞ্চদশ বৎসরে তাহার শিক্ষা, তাহার সাধনা, ন্যায়, বিবেচনা, তাহার জীবন যে শ্বেতরজ্জুর নাগপাশে বদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল - তাহার অন্তরলোকের নিভৃত কুটিরে না জানি আরো কত নাম না জানা অনুভূতি, অনুরাগ…যা যে কোনোদিনও প্রত্যক্ষ করিয়া দেখে নাই, হয়তো জানিতও নতাহার অন্তরের কাননেও এরম উন্মত্ত কামিনী ফুটিয়া রহিতে পারে, কস্মিনকালেও ভাবে নাই এই অনুভূতি পোষণ করিবার অনুমতি বা অধিকার তাহার কোনোদিন ছিল কিনা - সেসব যেন হঠাৎ বিদ্রোহ করিয়া উঠিল। বিদ্রোহ! হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিদ্রোহই বটে! উত্তপ্ত স্ফটিক শীতলের স্পর্শ পাইলে যেমন সহ্য করিতে পারে না কারন জন্মলগ্ন হইতে তাহাকে বলা হইয়াছে সে কঠোর, তাহাকে কঠোর থাকিতে হইবে, সে অনাবিল স্বাচ্ছন্দ্য, স্বতঃস্ফুর্ত আবেগ ভোগ করিবে কি প্রকারে? পাষাণ গলিয়া জল হয় ঠিকই, কিন্তু তা তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি। পাষাণ কে জল হইতে গেলে যে কিরূপ আত্বত্যাগ, যন্ত্রণা, শিকড় ছেড়ার ক্লেশ বহন করিতে হয় তাহা সে আর অন্তর্যামী ই জানেন। তারপর সেই স্নিগ্ধ ধারা মন্দার গতিতে চপলা নদীতে গিয়া মিলিত হয়। মাঝে কত পর্বত…কত পাথরসঙ্কুল উপত্যকা...
