Actions

Work Header

কালবৈশাখী

Summary:

ছয় ঋতুর গল্প।

Notes:

এই গল্পটি লিখে আমি আমার বাংলা পড়াশোনা শেষ করেছি। আর, কিছু কারণে আমি এটি সাধু ভাষায় লিখতে চেষ্টা করলাম, তাই সম্ভবত অনেক ভূল থাকবে। তাদের আমাকে নির্দেশ করুন! একটি বাংলা অধ্যাপিকা এটা প্রুফরিড করেছেন, তাই আশাকরি খুব বেশি হবে না

Chapter 1: গ্রীষ্ম

Chapter Text

সময়ের পূর্বে, পক্ষী ও বায়ুর দেবতা এই জগতে বিরাজ করিতেন। তাঁহার নাম আকাশী। তিনি সুখী ছিলেন: যখন উড়িতেন তখন মু্ক্ত ছিলেন, এবং ধরাতলে সুরক্ষিত ছিলেন। তিনি ঘাসের উপরে হাঁটিতেন এবং কেহ অতি নিকটে আসিলে হাসিতে হাসিতে উড়িয়া যাইতেন। তাঁহার প্রয়োজন অতি সামান্য ছিল। তিনি প্রেমের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, কিন্তু এটি একটি সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নহে। তিনি প্রেমের সন্ধানে ঘুরিতেন না। তিনি অনুসন্ধান করিতেন না, কিন্তু আশা করিতেন এবং অনুভব করিতেন যে তিনি যেখানেই উড়িয়া যান, একটি স্নিগ্ধ শক্তি তাঁহাকে পথ প্রদর্শন করিতেছে।

সময়ের পূর্বে, নদী ও সাগরের দেবতা এই সমুদ্রে বিরাজ করিতেন। তাঁহার নাম হ্রাঘব। কিন্তু তিনি সুখী ছিলেন না: তিনি অতি শক্তিশালী, অতিকায়, এবং সময় সময় অতি হিংস্র। তাঁহার ইচ্ছায় বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও, যাহাদের ভালোবাসিতেন, তাঁহারা তাঁহার ভারে নিষ্পেষিত হইয়া যাইতেন। তিনি ধরাতলে উপত্যকা উৎখনন করিয়াছিলেন, সমুদ্র তটে সৈকত, এবং যখন ক্রূদ্ধ অবস্থায় থাকিতেন না, তখন বিশ্রাম করিবার জন্য তরঙ্গের মাঝে সাঁতার কাটিতেন। অনেক সময় ভাসিয়া চলিতেন, জলের স্রোতে তাঁহাকে যেখানে, সুদূরে লোইয়া যাইত, যদিও উনি জানিতেন না জল তাঁহাকে কোথায় লোইয়া যাইবে। 

আকাশী প্রথমে তাঁহাকে দেখিলেন। এটি কি আশ্চর্য্য? না, তিনি একটি অভিনিবিষ্ট দেবতা। যাহা তিনি চান তাহাই দেখিয়া এবং চাহিয়া উপভোগ করেন। হ্রাঘব যখন নদীতে ভাসিয়া বেড়াইতেছিলেন, আকাশী তাঁহাকে উপভোগ করিলেন। হ্রাঘব যখন প্লাবনভূমিতে বদ্বীপের মত ছড়িয়া শুইলেন, আকাশী তাঁহার পেশীবহুল শরীর দেখিলেন। তাঁহাকে আহ্বাণ করার প্রচেষ্টা করিলেন না; তাঁহাকে থামাইবার চেষ্টা ও করিলেন না। যাহা তিনি অনূভব করেন তাহা করেন, এবং গান করেন।

হ্রাঘব প্রথমে তাঁহাকে শুনিলেন। এটি কি আশ্চর্য্য? না, তাঁহার শক্তি সত্ত্বেও, যখন তিনি শান্ত, তখন তিনি নীরব। আকাশী কদাচ সত্যই নীরব নহেন। হ্রাঘব সাধারণত শোনেন না, কিন্তু যখন কিঞ্চিৎ তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিত —আকাশী তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন—তখন শুধু সেদিকেই মনোনিবেশ করিতেন। তিনি থামিলেন, ধীর-প্রবাহ জলে ধীর পদক্ষেপে হাঁটিয়া আকাশীর প্রতি অভীগমন করিলেন। তিনি আকাশীর সংগীত উপভোগ করিলেন। তাঁহার স্বর মৃদুমন্দ বাতাসের মত। হ্রাঘব আকাশীর কাছে আসিয়া অপেক্ষা করিলেন।

আকাশী তাঁহার সংগীত সমাপ্ত করিয়া স্মিত হাসিলেন। তিনি হ্রাঘবকে স্পর্শ করিবার জন্য হস্ত প্রসারিত করিলেন। হ্রাঘব দৃঢ়কায় এবং বিশাল, তিনি কিন্তু আপাতত শান্ত ছিলেন।

হ্রাঘব হাসিলেন না, কিন্তু তিনি আগ্রহী। আকাশীর উপর তাঁহার মন নিবদ্ধ হইতেছে। হ্রাঘব এক হস্ত দিয়া আকাশীর হস্ত নিজের শরীরে চাপিয়া ধরিলেন। অন্যটির দিয়া আকাশীর মুখ স্পর্শ করিলেন। তিনি কোমল ও লঘুকায়।

আকাশী হ্রাঘবকে চুম্বন করিলেন।

হ্রাঘবের মন একমাত্র আকাশীর উপর নিবিষ্ট হইল।

আকাশীর ভাল লাগে হ্রাঘবের শক্তি: বন্যা, তরঙ্গ, ঝঞ্ঝা। তিনি যাহা হ্রাঘব তাঁহাকে দিতেছিলেন তাহা সমস্তই গ্রহণ করিলেন, এবং হ্রাঘব তাঁহাকে অনেক দিলেন। প্রায় দুর্বহ, প্রায় অত্যাধিক। তিনি কিঞ্চিৎ পিছাইয়া আসিলেন।

হ্রাঘবের ভাল লাগে আকাশীর স্নিগ্ধতা: মৃদুমন্দ বাতাস, পক্ষীর পালক ও বাসা। তিনি যতটি সম্ভব কম দিলেন, যদ্যপি অধিক দিতে চাহিলেন। প্রায় যথেষ্ট ছিল, প্রায় তৃপ্তিদায়ক। তিনি কিঞ্চিৎ অধিক দিলেন।

আকাশী হাঁপাইয়া উঠিলেন, কিন্তু যে বায়ু ভালবাসেন তাহা আসিল না। তাঁহার মুখ জলে ভরিয়া উঠিল। তাঁহার হস্ত হ্রাঘবকে ধাক্কা দিয়া সরাবার চেষ্টা করিল। তিনি ডুবিয়া যাইতেছিলেন।

হ্রাঘব গর্জন করিলেন, কিন্তু যে তৃপ্তি কামনা করিয়াছিলেন তাহা লাভ করিলেন না। তাঁহার জিহ্বা আকাশীর মুখ পূর্ণ করিল। তাঁহার হস্ত আকাশীকে আরও শক্ত করিয়া জড়াইয়া ধরিল। তিনি সম্পূর্ণ নিঃশ্বাস লইতে পারিলেন না।

প্রচণ্ড পবন, প্রবল বর্ষণ। 

কালবৈশাখী।

নিমেষে, আকাশীর ডানা ও পালক উৎপন্ন হইল, তাঁহার অস্থি ফাঁপা হইল, এবং উনি উড়িয়া গেলেন। কয়েক গজ দূরে বাতাসে ভাসিয়া রহিলেন। 

নিমেষে, হ্রাঘব যেই তৃপ্তিটি অনুধাবন করিতেছিলেন—হয়তো প্রেম; হয়তো প্রয়োজন—উড়িয়া গেল। তিনি তাহা ধরাবার চেষ্টা করিলেন।

আকাশী হ্রাঘবের ক্রোধ অনুভব করিয়া ভীত হইয়া বোঝাবার চেষ্টা করিলেন, ‘থামুন। আপনি অতি শক্তিশালী। যদি আমি এখানে প্রতিখ্যা করি, আমি জলমগ্ন হইব। শেষ করিতে, আমি তাহা চাই না। আমাকে যাইতে হইবে।’

হ্রাঘব আকাশীর কণ্ঠ শুনিয়া তৃষ্ণা অনুভব করিলেন, পুনরায় দৃঢ়তর অনুরোধ করিলেন, ‘না। তুমি আমার প্রয়োজন—তুমি যাইলে আমি কি করিব জানি না। আমি এইমাত্র অবশেষে খুঁজিয়া পাইলাম। থাকো—তোমার নামটিও একনও জানি না।’

‘আমি আকাশী’, তিনি বলিলেন। ‘পক্ষী ও বায়ুর দেবতা। আমাকে উড়িতে হইবে। থাকিতে চাই—এটি সমস্যা। আমি থাকিলে ডুবিতে চাহিব। সেই ভয়ে আমাকে চলিয়া যাইতে হইবে, আর কদাচ ফিরিয়া আসিব না।’

‘আমি হ্রাঘব!’ তিনি বলিলেন। ‘নদী ও সাগরের দেবতা। আমাকে লইতে হইবে। আমি শক্তিশালী —এটি সমস্যা। যখন আমি গ্রহণ করি, তখন ধ্বংস করি। তথাপি প্রেম বসত তোমার সঙ্গে সৌম্য করিব!’

‘আপনাকে লইতে হইবে, হ্রাঘব,’ আকাশী বলিলেন। ‘আমাকে উড়িতে হইবে। বিদায়।’ 

‘আমাকে লইতে হইবে, আকাশী,’ হ্রাঘব বলিলেন। ‘আসি।’

‘অনুগ্রহ করিয়া আমাকে অনুসরণ করিবেন না।’

‘তবে প্রত্যাবর্তন করুন।’

আকাশী আর কিঞ্চিৎ বলিতে না পারিয়া উড়িয়া গেলেন। 

হ্রাঘব আর কিঞ্চিৎ বলিতে না পারিয়া নদীতে নিমগ্ন হইলেন।